ময়মনসিংহ ০৪:১৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১৮ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ঈশ্বরগঞ্জ পৌরসভায় নাগরিক হয়রানি ও চরম অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ

দৈনিক মুক্তকণ্ঠ
  • আপলোড সময়: ০৩:১২:০৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর ২০২৬
  • / ৫৭ বার পড়া হয়েছে

মো.মনিরুজ্জামান,ময়মনসিংহ ব্যুরো:- ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ পৌরসভায় নাগরিক সেবা প্রাপ্তিতে চরম হয়রানি এবং ব্যাপক আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে পৌর প্রশাসক ও প্রশাসনিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। নাগরিক সনদ, জন্ম নিবন্ধন, চারিত্রিক সনদ ও ওয়ারিশান সনদ নিতে এসে একদিকে অতিরিক্ত টাকা গুনতে হচ্ছে, অন্যদিকে পদে পদে প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও প্রশাসকের দুর্ব্যবহার এবং প্রশাসনিক অনীহার শিকার হতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। অভিযোগ রয়েছে, পৌর সেবাকে জিম্মি করে এখানে গড়ে তোলা হয়েছে শক্তিশালী সিন্ডিকেট ও দালাল চক্র।

রবিবার ০৪ অক্টোবর থেকে বৃহস্পতিবার ০৮ অক্টোবর পর্যন্ত কথা হয় একাধিক ভুক্তভোগীর সঙ্গে। সরেজমিনে ভুক্তভোগীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, প্রতিনিয়ত সেবা নিতে এসে নাগরিকরা নাজেহাল হচ্ছেন। পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা আসমা আক্তার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমার মেয়ের জন্ম নিবন্ধনের জন্য দীর্ঘদিন ধরে ঘুরছি। পৌরসভা কার্যালয়ে গিয়ে অফিসের লোকনের সাথে কথা বলতে গেলে তারা পাত্তা দেয় না। মেয়ের রেজিস্ট্রেশন আটকে আছে, কিন্তু এখনো সনদ পেলাম না। আমরা হয়রানিমুক্ত সেবা চাই।”

একই ধরনের হয়রানির শিকার ইমতিয়াজ আহমেদ জানান, “জমি খারিজের জন্য ওয়ারিশান সনদ তুলতে সাত দিন ধরে পৌরসভা কার্যালয়ে ঘুরছি, কোনো কাজ হচ্ছে না। এক দালাল ৩ হাজার টাকা চাইছে, টাকা দিলে নাকি কাজ হয়ে যাবে! সচিবের ব্যবহার এত খারাপ যে উনার সাথে কথা বলাই যায় না।”

অপর ভুক্তভোগী শাহীন মিয়া বলেন, “আগে মেয়র থাকা অবস্থায় পরিচয়পত্র বাসায় পৌঁছে দিত। আর এখন দুই দিন ধরে ঘুরছি। পৌর প্রশাসনিক কর্মকর্তাকে টাকা দিলে নাকি সব কাজ সহজ হয়ে যায়।”

শুধু নাগরিক হয়রানিই নয়, পৌরসভার একাধিক খাত ও উন্নয়ন প্রকল্পে ভয়াবহ দুর্নীতির চিত্র উঠে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, মশা নিধনের সরকারি বরাদ্দ থেকে নিম্নমানের ওষুধ কিনে মোটা অঙ্কের টাকা হরিলুট করা হয়েছে। বিভিন্ন প্রকল্পে ভুয়া মাস্টাররোল তৈরি করে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ এবং ভুয়া ফাইল সাজিয়ে ১% ভূমি হস্তান্তর করের টাকা আত্মসাতের চাঞ্চল্যকর তথ্য মিলেছে। এ ছাড়া এডিপির (ADP) বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজে ঠিকাদারদের সাথে যোগসাজশে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। পৌর স্বায়ত্তশাসিত তহবিলের পাশাপাশি নিজস্ব আয় ও উন্নয়ন সহায়তা তহবিলেও মারাত্মক অনিয়মের আলামত পাওয়া গেছে। এসব অনিয়মের বিষয়ে তথ্য অধিকার আইনে বারবার আবেদন করেও কোনো তথ্য পায়নি স্থানীয় সচেতন মহল।

সচেতন নাগরিক হাবিবুর রহমান হাবিব বলেন, “আমরা পৌরসভার প্রতিটি কাজে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা চাই। প্রশাসকের কাছে গেলে তিনি সচিবের কাছে পাঠান, আর সচিবের কাছে গেলে বলেন প্রশাসক নেই—এভাবে নাগরিকদের হায়রানি করা হচ্ছে। মশা নিধনে বড় বরাদ্দ থাকলেও বাস্তবে কোনো কাজ হয়নি। মাঝে মাঝে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের অফিসের আশে পাশে ফগার মেশিন দিয়ে ধোঁয়া দেয়। ওষুধ ছাড়া ধোঁয়ায় মশাগুলো সাময়িক সময়ের জন্য উড়ে যায় কিছুক্ষণ পর আবার যেই সেই। এসব প্রকল্প ও কেনাকাটা তদন্ত করে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।”

পৌরসভার এসব অনিয়ম ও নাগরিক হয়রানির বিষয়ে জানতে পৌর প্রশাসক সালাহউদ্দিন বিশ্বাসের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। অন্যদিকে, পৌর প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো.জাহাঙ্গীর আলমের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি অনিয়মের দায় এড়ানোর চেষ্টা করেন এবং কৌশলগতভাবে সকল দায়ভার পৌর প্রশাসকের ওপর চাপিয়ে দেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের স্থানীয় সরকারের উপ পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) উম্মে হাবিবা মীরা বলেন, ইতিমধ্যে বিষয়গুলো সম্পর্কে অবগত হয়েছি। সকল বিষয়ে তদন্ত পূর্বক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

ট্যাগস :

Please Share This Post in Your Social Media

About Author Information

ঈশ্বরগঞ্জ পৌরসভায় নাগরিক হয়রানি ও চরম অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ

আপলোড সময়: ০৩:১২:০৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর ২০২৬

মো.মনিরুজ্জামান,ময়মনসিংহ ব্যুরো:- ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ পৌরসভায় নাগরিক সেবা প্রাপ্তিতে চরম হয়রানি এবং ব্যাপক আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে পৌর প্রশাসক ও প্রশাসনিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। নাগরিক সনদ, জন্ম নিবন্ধন, চারিত্রিক সনদ ও ওয়ারিশান সনদ নিতে এসে একদিকে অতিরিক্ত টাকা গুনতে হচ্ছে, অন্যদিকে পদে পদে প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও প্রশাসকের দুর্ব্যবহার এবং প্রশাসনিক অনীহার শিকার হতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। অভিযোগ রয়েছে, পৌর সেবাকে জিম্মি করে এখানে গড়ে তোলা হয়েছে শক্তিশালী সিন্ডিকেট ও দালাল চক্র।

রবিবার ০৪ অক্টোবর থেকে বৃহস্পতিবার ০৮ অক্টোবর পর্যন্ত কথা হয় একাধিক ভুক্তভোগীর সঙ্গে। সরেজমিনে ভুক্তভোগীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, প্রতিনিয়ত সেবা নিতে এসে নাগরিকরা নাজেহাল হচ্ছেন। পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা আসমা আক্তার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমার মেয়ের জন্ম নিবন্ধনের জন্য দীর্ঘদিন ধরে ঘুরছি। পৌরসভা কার্যালয়ে গিয়ে অফিসের লোকনের সাথে কথা বলতে গেলে তারা পাত্তা দেয় না। মেয়ের রেজিস্ট্রেশন আটকে আছে, কিন্তু এখনো সনদ পেলাম না। আমরা হয়রানিমুক্ত সেবা চাই।”

একই ধরনের হয়রানির শিকার ইমতিয়াজ আহমেদ জানান, “জমি খারিজের জন্য ওয়ারিশান সনদ তুলতে সাত দিন ধরে পৌরসভা কার্যালয়ে ঘুরছি, কোনো কাজ হচ্ছে না। এক দালাল ৩ হাজার টাকা চাইছে, টাকা দিলে নাকি কাজ হয়ে যাবে! সচিবের ব্যবহার এত খারাপ যে উনার সাথে কথা বলাই যায় না।”

অপর ভুক্তভোগী শাহীন মিয়া বলেন, “আগে মেয়র থাকা অবস্থায় পরিচয়পত্র বাসায় পৌঁছে দিত। আর এখন দুই দিন ধরে ঘুরছি। পৌর প্রশাসনিক কর্মকর্তাকে টাকা দিলে নাকি সব কাজ সহজ হয়ে যায়।”

শুধু নাগরিক হয়রানিই নয়, পৌরসভার একাধিক খাত ও উন্নয়ন প্রকল্পে ভয়াবহ দুর্নীতির চিত্র উঠে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, মশা নিধনের সরকারি বরাদ্দ থেকে নিম্নমানের ওষুধ কিনে মোটা অঙ্কের টাকা হরিলুট করা হয়েছে। বিভিন্ন প্রকল্পে ভুয়া মাস্টাররোল তৈরি করে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ এবং ভুয়া ফাইল সাজিয়ে ১% ভূমি হস্তান্তর করের টাকা আত্মসাতের চাঞ্চল্যকর তথ্য মিলেছে। এ ছাড়া এডিপির (ADP) বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজে ঠিকাদারদের সাথে যোগসাজশে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। পৌর স্বায়ত্তশাসিত তহবিলের পাশাপাশি নিজস্ব আয় ও উন্নয়ন সহায়তা তহবিলেও মারাত্মক অনিয়মের আলামত পাওয়া গেছে। এসব অনিয়মের বিষয়ে তথ্য অধিকার আইনে বারবার আবেদন করেও কোনো তথ্য পায়নি স্থানীয় সচেতন মহল।

সচেতন নাগরিক হাবিবুর রহমান হাবিব বলেন, “আমরা পৌরসভার প্রতিটি কাজে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা চাই। প্রশাসকের কাছে গেলে তিনি সচিবের কাছে পাঠান, আর সচিবের কাছে গেলে বলেন প্রশাসক নেই—এভাবে নাগরিকদের হায়রানি করা হচ্ছে। মশা নিধনে বড় বরাদ্দ থাকলেও বাস্তবে কোনো কাজ হয়নি। মাঝে মাঝে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের অফিসের আশে পাশে ফগার মেশিন দিয়ে ধোঁয়া দেয়। ওষুধ ছাড়া ধোঁয়ায় মশাগুলো সাময়িক সময়ের জন্য উড়ে যায় কিছুক্ষণ পর আবার যেই সেই। এসব প্রকল্প ও কেনাকাটা তদন্ত করে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।”

পৌরসভার এসব অনিয়ম ও নাগরিক হয়রানির বিষয়ে জানতে পৌর প্রশাসক সালাহউদ্দিন বিশ্বাসের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। অন্যদিকে, পৌর প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো.জাহাঙ্গীর আলমের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি অনিয়মের দায় এড়ানোর চেষ্টা করেন এবং কৌশলগতভাবে সকল দায়ভার পৌর প্রশাসকের ওপর চাপিয়ে দেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের স্থানীয় সরকারের উপ পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) উম্মে হাবিবা মীরা বলেন, ইতিমধ্যে বিষয়গুলো সম্পর্কে অবগত হয়েছি। সকল বিষয়ে তদন্ত পূর্বক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।