পানির জন্য হাহাকার: প্রয়োজন স্থায়ী সমাধান
- আপলোড সময়: ০১:৪৫:১৯ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৭ এপ্রিল ২০২৬
- / ৯৮ বার পড়া হয়েছে

শেরপুর থেকে ফিরে…খলিলুর রহমান:- বিশুদ্ধ খাবার পানি ও সেচের পানির জন্য শেরপুর জেলার তিন উপজেলার ২০ গ্রামের প্রায় ৩০ হাজার সাধারণ মানুষের হাহাকার বাড়ছে। ঘুরে ফিরে একই চিত্র প্রতিবছরের খড়া মৌসুমের। পাহাড়ী জনপদে সেচ ও বিশুদ্ধ খাবার পানির সংকট। নেই আগাম প্রস্তুতি। সংশ্লিষ্টদের নির্বিকার নীরবতা। আছে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সমন্বয় হীনতাও। স্থানীয়দের অভিযোগ নির্বাচন আসলে পান প্রতিশ্রুতি কিন্তু পানি পাননা। সরকার আসে, সরকার যায় কিন্তু তাদের পানির ব্যবস্থা হয়না। “শেরপুর সীমান্তে সুপেয় পানির হাহাকার: মাইলের পর মাইল হেঁটেও মিলছে না পানি” শীরনামে ২৬ মার্চ একটি জাতীয় দৈনিকে সংবাদ প্রকাশিত হয়। প্রকাশিত সংবাদের আলোকে অনুসন্ধানে জানাযায়, সংবাদে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, শেরপুরের সীমান্তবর্তী গারো পাহাড়ী জনপদে সুপেয় পানির সংকট দেখা দিয়েছে। শুষ্ক মৌসুম শুরু হতেই ভূগর্ভস্থ পানির স্তর অস্বাভাবিক নিচে নেমে যায়। এই সময় সাধারণ টিউবওয়েলগুলো অকেজো হয়ে পড়ে। ফলে বাধ্য হয়ে পাহাড়ের ঝরনা, খোলা কুয়া ও পুকুরের অস্বাস্থ্যকর পানি পান করে হাজার হাজার মানুষ জীবন বাঁচানোর চেষ্টা করছে। ফলে সীমান্ত এলাকায় পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বাড়ছে। সংবাদ পর্যালোচনায় দেখা যায়, শেরপুর জেলার শ্রীবরদী, ঝিনাইগাতী ও নালিতাবাড়ী উপজেলার মালাকোচা, বালিজুরি, তাওয়াকুচা ও গজনীসহ অন্তত ২০টি গ্রামের জনজীবনের চরম দুর্ভোগে নিপতিত হয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানাযায়,পাশ^বর্তী সীমান্ত এলাকার অবস্থাও প্রায় একই রকম। স্থানীয় একাধিক সূত্র জানাযায়, শুষ্ক মৌসুমে পানির স্তর ১০০ থেকে ১২০ ফুট নিচে নেমে যায় সাধারণ টিউবওয়েলগুলো কোনো কাজে আসছে না। যদিও বিত্তশালীরা ব্যক্তিগত খরচে সাবমার্সিবল পাম্প বসাতে পারলেও সাধারণ মানুষের সেই সামর্থ্য নেই। স্থানীয় ভূক্তভোগীদের অভিযোগ, বিশুদ্ধ পানির অভাবে বাধ্য হয়ে পুকুর, ঝর্ণা ও কুয়ার পানি ব্যবহার করছেন স্থানীয়রা। এতে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ার পাশাপাশি কৃষিকাজও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। সেচের অভাবে ফসলও নষ্ট হচ্ছে। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের তথ্যমতে শুষ্ক মৌসুমে এই অঞ্চলের প্রায় ৭০ শতাংশ টিউবওয়েল অকেজো হয়ে পড়ে। পাথুরে মাটির কারণে এখানে সাধারণ টিউবওয়েল টেকসই হয় না। ফলে প্রতিবছরই এই এলাকায় পানির স্তর নিচে নেমে যায় এবং পানির এই সংকটের সৃষ্টি হয়। ফলে খাবার পানির পাশাপাশি শুষ্ক মৌসুমে জমিতে সেচ দেওয়া যায় না। এতেকরে কৃষি ফসল উৎপাদনও ব্যহত হয়। অভিযোগ রয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে এই বিষয়ে আগাম প্রস্তুতি থাকলে সংকট সৃষ্টি হতোনা। শেরপুর জেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ জামাল হোসেন জানান, ওখানে বিশুদ্ধ পানির সংকট থাকার কথা নয়। ইতিমধ্যে প্রতিটি ইউনিয়নে ২৪টি করে সাবমার্সিবল পাম্প স্থাপন করা হয়েছে। তিনি জানান, কৃষকরা চাচ্ছেন ওই খাবারের পানি সেচ কাজে ব্যবহার করার জন্য। এই পানি সেচকাজে ব্যবহার করা যাবেনা। মোহাম্মদ জামাল হোসেন বলেন, আমরা শুধু খাবার পানির ব্যবস্থা করে থাকি সেচের বিষয়টি কৃষি বিভাগ দেখে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ সাখাওয়াত হোসেন জানান, ইতিমধ্যে তারা গ্রুপ মিটিং করেছেন, যাতে করে বোরো চাষে পানির সংকট না থাকে। তবে পানি সংকটের স্থায়ী সমাধানের বিষয়ে তিনি কিছু বলতে পারেন নি। যোগাযোগ করা হলে জেলা প্রশাসক তরফদার মাহমুদুর রহমান বলেন, এবিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তর ভালো বলতে পারবেন। এই মুহুর্তে তার কাছে বিস্তারিত কোন তথ্য নেই। পানি সংকটের স্থায়ী সমাধানের জন্য সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে কোন নির্দেশনাও উনার কাছে নেই বলে তিনি জানান। অনুসন্ধানে যে বিষয়টি দৃশ্যমান হয়েছে, তাহলো এই বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তর গুলির সমন্বয় হীনতা। এমন জনদুভোর্গের-জনগুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় জেলা প্রশাসকের নজরে নেই! এটি আমাদের বিস্মিত করেছে। আমরা মনেকরি বিষয়টি আরোও আগে জেলা প্রশাসকের নজরে আসা প্রয়োজন ছিলো। এমন একটি বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সমন্বয়হীনতার বিষয়টিও খতিয়ে দেখা উচিত। স্থানীয়দের সবচেয়ে বড় অভিযোগ নির্বাচন আসলে তারা জনপ্রতিনিধিদের কাছ থেকে প্রতিশ্রুতিপান কিন্তু পানি পাননা। সরকার আসে সরকার যায় কিন্তু তাদের এই সংকটের সমাধান হয় না। আমাদেরও প্রশ্ন ঐ অঞ্চলের জনসাধারণের ভোট নেয়ার সময় জনপ্রতিনিধিরা যে প্রতিশ্রুতি দেন তা তারা কিভাবে ভূলে যান। কেনো সেগুলো বাস্তবায়ন হয় না। একদিকে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়া অন্যদিকে জলবায়ূ পরিবর্তনের ফলে দিনদিন বিশুদ্ধ পানির সংকট বৃদ্ধি পাচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রতিবছর ওই এলাকায় পানির সংকট হলেও সংকট সমাধানে কার্যকর কোন পদক্ষেপ দৃশ্যমান নয়। দূষিত পানি পান করে মানুষ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়ে মারাতœক স্বাস্থ্য ঝুঁকিতেও পড়তে পারে। আমারদের জাতীয় অর্থনীতিতে কৃষির বিরাট ভূমিকা রয়েছে তাই কৃষি উৎপাদন অব্যাহত রাখতে পানির কোন বিকল্প নেই। আমরা মনেকরি এমন অত্যাবশ্যকীয় একটি বিষয় সংশ্লিষ্ট প্রশাসন তথা সরকারের আরোও গুরুত্বদিয়ে দেখা উচিত। ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে পানির স্তর ক্রমেই অস্বাভাবিকভাবে নিচে নেমে যাচ্ছে। ভূগর্ভস্থ পানির উত্তোলন কমিয়ে ভূউপরিস্থ পানির ব্যবহার না বাড়ালে ভূমিধসসহ নানা সংকট বাড়বে।
পরিবেশ উন্নয়নকর্মী ও আসপাডা পরিবেশ উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী লায়ন মোঃ আব্দুর রশিদ বলেন, খাবার পানি বা সেচের পানির সংকট দেখা দিলে এর প্রভাব পরিবেশের উপর পড়ে। তাছাড়া গ্রামে পুকুর, খাল-বিল-নদী ও ছোট ছোট জলাশয় গুলে ভরাট হয়ে যাচ্ছে। ফলে সেচকাজ ও গৃহস্থালীর সাধারণ কাজে ব্যবহার যোগ্য পানির উৎস বন্ধ হয়ে পড়েছে। নদনদী, খাল-বিল ও জলাশয় রক্ষায় আমাদের আরোও কঠোর হওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি বেশি করে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও ব্যবহারে ব্যবস্থা করতে হবে। পানি ব্যবহারে সংযমী হতে জনসাধারণকে উৎসাহী করতে হবে। ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার হৃাস করা এবং ভূপৃষ্ঠের পানির ব্যবহার বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। পুকুর, দিঘি, খাল-বিল-নদীসহ যে কোনো জলাশয় ভরাট বন্ধ করতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। পানি সংকটের স্থায়ী সমাধানের লক্ষে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।










